অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হতে হবে যুগোপযোগী

লোকসানি সব ধরনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধ করে সেখানে বেসরকারি খাতকে সুযোগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেশকিছু চিনিকলও বন্ধ করা হয়েছে, আরো কিছু চিনিকলও বন্ধের পরিকল্পনায় রয়েছে। পাট ও চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে লোকসান দিয়ে আসায় সরকার এসব বন্ধ করে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। তবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখবে। এছাড়া অস্ত্র কারখানার মতো কিছু প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সরকার। এরই আলোকেই করা হচ্ছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। সেজন্য বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়িয়ে ৮১ শতাংশ এবং সরকারি খাতে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম জানিয়েছেন।সম্প্রতি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্রে (সিরডাপ) লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ আয়োজিত ডেভেলপমেন্ট প্লানিং এক্সপেরিয়েন্সেস ইন বাংলাদেশ (ফলোয়িং অ্যা প্ল্যানড পাথ অব গ্রোথ উইথ অ্যা ভিশন) শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি জানান, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পথে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা দেখে দেওয়ার পরই বিষয়টি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তোলা হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি কলকারখানা বন্ধ করা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা। কারণ শ্রমিকদের কারণে লোকসান হয় না। হয় মূলত প্রশাসনের লুটপাট, দুর্নীতির কারণে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে এর ফল ভোগ করতে হবে শ্রমিকদের। তারা কর্মহীন হয়ে পড়বে। সে সঙ্গে পাবলিক সেক্টরে যে ন্যূনতম মজুরির জায়গা তৈরি হয়েছে, সেটাও কার্যকর থাকবে না। এটা স্পষ্টতই গণবিরোধী নীতি। শামসুল আলম আরো বলেন, সরকার কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিচ্ছে, আমি এমনটা মনে করি না। লাভজনক হলে সরকার চালাতে পারবে। যদিও বেসরকারি খাতে গেলে আরো বেশি লাভ হতে পারত। ন্যূনতম লাভজনক হলে সরকার সেটা চালাবেই, এটা হলো আমাদের নীতি। কিন্তু যেগুলোতে ঘাটতি দিতে হচ্ছে বছরের পর বছর, সেগুলোকে ছেড়ে দেবে সরকার। এটা প্রকাশ্যেই আমরা প্ল্যানে (অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা) বলেছি। লস ট্রেকিংগুলোকে (লোকসানি কলকারখানা) জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে চালিয়ে রাখা যায় না।

দিস ডকুমেন্ট (অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা) ইজ বেসিক্যালি অ্যা পলিটিক্যাল ডকুমেন্ট (এটি একটি রাজনৈতিক নথি)। রাজনৈতিক সরকার ডকুমেন্টটি তৈরি করছে। এটা শামসুল আলমের ডকুমেন্ট না, বলেন তিনি। তারপরও ব্যক্তি খাতে আসতে পারে না বা আসবে না এমন কিছু শিল্প-কারখানা চালু রাখবে সরকার। যেমন এক সময় এ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন রাষ্ট্রই করত, কারণ এত বড় বিনিয়োগে বেসরকারি খাত আসত না। এখন বেসরকারি খাত আসে। একটা সময় শিক্ষা ছিল জনপণ্য। এখন তা বেসরকারি খাতে আসছে। বেসরকারি খাত যেটা পারে, তারা সেটা অবশ্যই করবে। শিল্প-কারখানা সরকার সেটুকুই করবে, যেমন অস্ত্র কারখানা। এটা রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে। কারণ অস্ত্র বেসরকারি খাতে গেলে সেটা যে-কোনো মানুষের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দেশ আগের মতো মুক্ত অর্থনীতির দিকে যাবে উল্লেখ করে বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক শেষের পর্যায়ে আছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মুক্ত অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছিলাম। এবার আরো বেশি জোর দেয়া হয়েছে। ৮১ শতাংশ আসবে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। ৭৭ শতাংশ বিনিয়োগ বলেছিলাম সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। ধীরে ধীরে আমরা বিশ্ব অর্থনীতির দিকে যাচ্ছি। আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি রপ্তানি বৃদ্ধিতে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেসরকারি খাতকে মূল ড্রাইভিং সিটে রাখা হবে। সরকারের ১৯ শতাংশেরও গুরুত্ব অনেক। কারণ সে সুশাসন দেবে, বিনিয়োগ করার স্বাধীনতা থাকবে, সেটার সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সে কাজ সরকার করবে। আমি বাংলো কিনলে সেটা কেউ দখল করে নিয়ে যাবে না। সম্পত্তি অর্জন করলে সেটা কেউ নিয়ে যাবে না, এটার নিশ্চয়তা রাষ্ট্র দেবে। অবকাঠামোতে যেখানে বেসরকারি খাত আসবে না, সেটা সরকার করে দেবে। এজন্য অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হবে আরো বাজারমুখী। ক্রমাগত ঘাটতিতে থাকা পাট ও চিনিকলগুলো চালু রাখার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের এ সদস্য। সরকার বাধ্য হয়ে এখন পাটকলগুলো চালায়। ২৯টি শিপ থেকে এখন আমরা ৮টায় নেমেছি। তারপরও ৩টা কিনতে দিয়েছি ৫ মাস আগে। কয়েক বছর পরে তারা বলবে আরো দুইটা দেন, তাহলে আমরা ব্যবসা করতে পারবো। মূলত এই ব্যবসা হলো জনগণের টাকার অপচয়।

একটা সময় সিমেন্ট রাষ্ট্র খাতে ছিল। এখন সিমেন্ট রফতানি হয়। এখনতো সরকারের সিমেন্ট কারখানা চালানোর কোন দরকার নেই। সরকারের বিমানখাত চালানোর কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। ইতালিয়ান এয়ারলাইনস আলিতালিয়া আর নেই। একসময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটা নামকরা এয়ারলাইনস ছিল, সেটাও এখন আর নেই। তাই ঘাটতি হচ্ছে এমন কিছু সরকারি খাতে রাখা উচিত নয়। কারণ এতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা নষ্ট হয়। সরকার সেটা রাখবে, যেটা সফলভাবে চলছে। সেটা রাখতে অসুবিধা নেই। সরকারের লোকসানি কারখানা বন্ধের এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বলেন, আমি তো মনে করি, এটা ঠিক লাইনেই আছে। সরকার ব্যবসা করতে গেলে সেখানে ভেসে যায়, বিভিন্ন রকমের দুর্নীতি অপচয় হয়ে থাকে। এটা যুগ যুগ ধরেই হচ্ছে। আবার অদক্ষতা আছে। চাকরিতে ঢুকার পর ভাবে কাজ করি বা না করি- চাকরিতো যাবে না। এগুলো আমরা তো দেখছি।অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং বেসরকারি খাতকেই এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে সরকারের ভর্তুকি বা চ্যারিটি করার সুযোগ নেই। বরং সেই অর্থ জনগণের কল্যাণের জন্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করুক। আরো স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল হোক। পাশাপাশি ব্যক্তিখাত যেন ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারে, সে নীতিমালা সহজ করে তাদের উৎসাহিত করা উচিত।

তবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাট ও চিনিকল বন্ধের প্রতিবাদে নিয়মিত সভা-সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন করে বাম রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো। তারা রাষ্ট্রায়ত্ত অলাভজনক বা লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোর বিরোধী। এ বিষয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারি খাতের লোকসানে থাকা কলকারখানা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। কারণ লোকসানটা হয় মূলত মাথাভারী প্রশাসন, লুটপাট, দুর্নীতির কারণে। সেক্ষেত্রে লোকসানি খাত যদি বন্ধ করতে হয়, সবার আগে বন্ধ করা দরকার খোদ সরকারকে। সরকারকে বন্ধ করে দিলে লোকসানি খাতটা বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ সরকার নিজেই সবচেয়ে বড় লোকসানি খাত। সরকার কিন্তু মাথাভারী প্রশাসন ও দুর্নীতি বন্ধ করছে না। প্রশাসনে মোটামাথার অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে রেখেছে। বিশেষত উচ্চ পদগুলোতে বিপুল ব্যয় করে জনগণের মাথাপিছু ব্যয় বাড়িয়ে ফেলেছে। জনগণের টাকা দিয়ে সরকার একটা মাথাভারী প্রশাসন লালনপালন করছে। তারা অবাধে দুর্নীতি, লুটপাত করছে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ না করে পাবলিক সেক্টরের যেসব কলকারখানা রয়েছে, সেগুলো বন্ধ করার দিকে যাচ্ছে। ফলে প্রচুর লোক কর্মসংস্থান হারাবে। মূলত- দেশে পাবলিক সেক্টরে মজুরির ন্যূনতম যে জায়গা তৈরি হয়েছিল, সেটা যেন আর কার্যকর না থাকে, তার জন্যই তারা কাজ করছে। ফলে এটা স্পষ্টতই একটা গণবিরোধী নীতি। বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন মনে করেন, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কেবল লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধই যথেষ্ট নয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য গত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও অনেকটা একই রকম ছিল। তবে সেরকম বিনিয়োগ আসেনি। যেসব কারণে বিনিয়োগ আসেনি, সে বাধাগুলোকে যদি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দূর করার কার্যক্রম না নেয়া হয়, তাহলে একই ফল হবে।

শুধু অলাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি খাতের জন্য খুলে দেওয়া যথেষ্ট হবে না। কারণ বেসরকারি খাতকে কীভাবে খুলে দিচ্ছেন, সেটার ওপর নির্ভর করবে তারা সেটাতে আগ্রহী হবে কি-না। তার চেয়ে বড় কথা হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান আর কয়টা আছে? ৮১ শতাংশ বিনিয়োগ আনার আগ্রহ থাকলেও ওই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। অলাভজনকের মধ্যে যেগুলো শিল্প খাতের, সেবা-বাণিজ্য খাতের প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর বাইরে অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আনা যাবে না। যেমন বিআইডব্লিউটিএ, বিটিআরটিসি- এগুলোও তো সরকারি প্রতিষ্ঠান। এগুলো নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান। এখানে তো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আনা সম্ভব না। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জমি, ইউটিলিটি বাড়ানোর, দক্ষ শ্রমিকের সমস্যা এবং আইনকানুনের জটিলতা দূর করতে হবে। এগুলোর কারণেই বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। আংশিক নয়, এগুলো পুরোপুরিভাবে সংস্কার করতে হবে। শুধু লক্ষ্য থাকলেই হবে না। একটা অর্থনৈতিক অঞ্চল পুরোপুরি গড়ে তুলতে না পারলে বিনিয়োগ হবে না। তারপর ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) বলছি আমরা করবো। কিন্তু ওই সেবা না পাওয়া পর্যন্ত যতই কাজ করা হোক না কেন, বিনিয়োগকারীদের কাছে সুফল যাচ্ছে না। আরও অন্যান্য যে বাধাগুলো আছে সেগুলো দূল করতে হবে। বিশেষ করে বন্দরের দক্ষতা ও সড়কের চলাচল যোগ্যতা বাড়াতে হবে। কারণ এগুলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা। এসব জায়গায় অবস্থার পরিবর্তন না করতে পারলে ওই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। বেসরকারি বিনিয়োগও দরকার আছে বলে মনে করেন জোনায়েদ সাকিও। বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ দরকার। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে দুর্নীতি কমানো, অবকাঠামো, নীতি, ব্যাংকিং সুবিধা নানাসহ সুযোগ-সুবিধা দরকার। এসব জায়গা এখনো বিপজ্জনকভাবে বিনিয়োগবান্ধব হওয়ার বদলে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারির ক্ষেত্রে ভীষণ রকম বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা আছে। ফলে এখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারে বিনিয়োগ ও শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের অসামঞ্জস্যতাই সেটা বলে দেয়। সরকার এখানেও তার ক্রমাগত ব্যর্থতা দেখিয়ে যাচ্ছে। সরকার উন্নয়নের নামে যে প্রবৃদ্ধির কথা বলে যায় তা তো একটা গালভরা কথা। প্রবৃদ্ধি মানেই তো উন্নয়ন নয়। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যদি সামঞ্জস্যভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে উন্নতি যে হচ্ছে সেটা দাবি করা যাবে না। বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে না। শামসুল আলম বলেন, আমাদের বড় উদ্বেগ হলো আয়-বৈষম্য। এটা যেন না বাড়ে। যদিও উন্নয়নের একটা পর্যায়ে গিয়ে আয়-বৈষম্য বাড়েই। এটা রোধ করা যায় না। কারণ উচ্চবিত্ত যত অবদান রাখে ব্যবসা-বাণিজ্যে, যত যোগ করে অর্থনীতিতে, গরিবরা সে পরিমাণ পারে না। যেহেতু যোগ করতে পারে না, তাই যারা উৎপাদন করছে তাদের ভাগে এখন বেশি যাবে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি, বৈষম্য যেন মারাত্ম আকারে না হয়। ধনী শ্রেণির কাছ থেকে ট্যাক্সের মাধ্যমে টাকা-পয়সা নিয়ে শিক্ষা ফ্রি করে দরিদ্রদের সুযোগ দেয়া। স্বাস্থ্যে খরচ করে মানবসম্পদ তৈরি, গ্রাম-গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো তৈরি করে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে আয়-বৈষম্য কমিয়ে আনার সুস্পষ্ট নীতি আমরা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গ্রহণ করেছি। বিধবা, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, মাতৃত্বকালীন এরকম ১২৫টি ভাতা আছে। এগুলোর লক্ষ্য হলো আয়-বৈষম্য কমিয়ে রাখা। এ বিষয়ে ড. জাহিদ বলেন, কেবল সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আয়-বৈষম্য রোধ করা সম্ভব নয়। আয় বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি অবশ্যই আছে। সেজন্য এ প্রক্রিয়ার (৮১ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ) সঙ্গে যেন সবাই সম্পৃক্ত হতে পারে এবং বিনিয়োগের সুযোগগুলো যেন বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত না থাকে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো এন্টারপ্রাইজগুলোকে সম্পৃক্ত করা না গেলে বৈষম্য বাড়বেই। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বেসরকারি খাত হচ্ছে কৃষি। কৃষির যদি উৎপাদনশীলতা না বাড়ানো যায়, কৃষকের আয় যদি না বাড়ে তাহলে বৈষম্য তৈরি হবেই। সেজন্য বিনিয়োগগুলো যেন সর্বত্র হয় এবং সুযোগগুলো ছোট-বড় সবাই যেন পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ছোটগুলো যেন ছোট না থেকে বড় হওয়ার সুযোগ পায়, সেজন্য সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে এই শ্রেণিকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। কোল্ড স্টোরের অভাব, গ্যারান্টর না থাকায় তারা ফরমাল সেক্টরে কোনো রেজিস্ট্রেশন করতে পারে না। ফলে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। ঋণের সুযোগও পায় না। এই শ্রেণিখাত থেকে উন্নয়নের যে বাধাগুলো আছে, এগুলো দূর করতে হবে। তাহলে বিনিয়োগের সুযোগগুলো ওখানেও যাবে। শ্রমিকরা মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন। তাদের দক্ষতা না বাড়লে ভালো আয়ের চাকরি পাবে না। কারিগরি শিক্ষায় সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সে সঙ্গে মৌলিক শিক্ষার মান প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে বাড়াতে হবে, না হলে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ারই সুযোগ থাকে না। বেসরকারি বিনিয়োগ যেন বৈষম্য বাড়াতে না পারে, সেজন্য এগুলো করতে হবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়লে কিছু আপেক্ষিক বৈষম্য বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সবার যদি আয় বাড়তে থাকে, তাহলে একজনের ২০ শতাংশ একজনের ১৫ শতাংশ হলেও সবাই ওপরের দিকে যাবে। সবার কমবেশি আয় বৃদ্ধি অন্তত নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে বৈষম্য বাড়লেও তা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না। কিন্তু একটা বড় জনগোষ্ঠীর আয় স্থবির থাকলো বা কমে গেল, গুটি কয়েক মানুষের আয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেল, সমস্যার সৃষ্টি হবে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*