নতুন বছরে নতুন করে ৩ পরিকল্পনায় বিএনপির!

রাজনীতিতে ‘চরম নেতিবাচক অভিজ্ঞতা’ উপহার দেয়া একাদশ সংসদ নির্বাচনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি হতে চলেছে। ওই নির্বাচন নিয়ে বহুমুখী প্রশ্ন ও দাবি-দাওয়া থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষে ময়দানে শক্ত কোনো প্রতিবাদ এখনো গড়ে উঠেনি।

নতুন বছরও সরকারি দলের অনুকূলে কাটবে এমনটাই আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। ২০২১ সাল স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতার উৎসব ঘিরে ইতোমধ্যে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।শাসক দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি নতুন বছরে মোটাদাগে তিনটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চিন্তা করছে।

প্রথমত, ‘স্বাধীনতার ঘোষকের দল’ হিসেবে সুবর্ণ জয়ন্তীতে বছরব্যাপী কর্মসূচি পালন, দ্বিতীয়ত : নতুন বছরের মধ্যে সংগঠন গোছানোর শতভাগ কাজ সম্পন্ন করা এবং দলটির পুরনো রাজনৈতিক দাবি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিকে ক্রমান্বয়ে ইস্যুতে পরিণত করা। দলীয় সূত্র মতে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ২০২০ সাল শেষ করতে চায় প্রতিবাদ মুখরতার মধ্য দিয়ে।

একাদশ নির্বাচনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিন আগামী ৩০ ডিসেম্বর বুধবার ঢাকাসহ সারা দেশের জেলা শহরে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি পালন করা হবে। ‘কালো দিবস’ হিসেবে দিনটি পালন করতে ইতোমধ্যে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ওই দিন জেলা ও মহানগর পর্যায়ে বেলা ১১টায় বিক্ষোভ সমাবেশ হবে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর যৌথভাবে ঢাকায় সমাবেশ করবে।

সুবর্ণ জয়ন্তীর উৎসব হবে সার্বজনীন : নতুন বছরে বিএনপি সিরিজ কর্মসূচির পরিকল্পনা করছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে ঘিরেই। দলটি স্বাধীনতার এই উৎসবকে সার্বজনীন রূপ দিতে চায়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে এই উৎসবের কর্মসূচি প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি দলীয় একটি ফোরামে বলেছেন, ‘শেরেবাংলা থেকে শুরু করে শেখ মুজিব-জিয়াউর রহমান হয়ে আতাউল গণি উসমানী পর্যন্ত, যাদের ছাড়া স্বাধীনতার ইতিহাস কখনোই পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে না।’

দলীয় সূত্র মতে, রজতজয়ন্তীর উৎসবের সূচনার জন্য তিনটি তারিখ ভাবা হয়েছে। ১৯ জানুয়ারি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শ’হীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী ঘিরে অনুষ্ঠানমালার সূচনা হতে পারে। অথবা স্বাধীনতা যু’দ্ধের আনুষ্ঠানিক দামামা বেজে ওঠার দিন ১ মার্চ কিংবা স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চে সুবর্ণজয়ন্তীর বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হতে পারে।

বিএনপি ইতোমধ্যে এই উৎসব পালনে বেশ কিছু কমিটি গঠন করেছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির বছরব্যাপী অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে আহ্বায়ক ও উপদেষ্টা আব্দুস সালামকে সদস্যসচিব করে ১৩৪ সদস্যের জাতীয় কমিটি করা হয়েছে।

একটি স্টিয়ারিং কমিটিও করা হয়েছে। এই দুটি কমিটিতে স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের রাখা হয়েছে। এর বাইরেও ১৫টি বিষয়ভিত্তিক কমিটি এবং ১০টি বিভাগীয় কমিটি করা হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেছেন, সুবর্ণ জয়ন্তীকে ঘিরে বহু কমিটি হয়েছে।

এখন পুরো কর্মসূচির সমন্বিত বাস্তবায়ন জরুরি। কোন কমিটির কী কাজ তা সুনির্দিষ্ট করা দরকার। বিষয়ভিত্তিক ১৫টি কমিটির মধ্যে অন্তত চারটি কমিটি এমন রয়েছে, যেগুলোকে দুটি কমিটিতে রূপ দিলে কাজ সূচারুভাবে হতো বলে কেউ কেউ মনে করছেন। সে ক্ষেত্রে প্রচার ও মিডিয়া কমিটি আলাদা না হয়ে একটি এবং প্রকাশনা ও স্মরণিকা কমিটি পৃথক না হয়ে একটি কমিটি করা যেত বলে তাদের মত।

প্রচার কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। মিডিয়া কমিটির আহ্বায়ক ইকবাল হাসান মাহমদ টুকু ও সদস্যসচিব শামা ওবায়েদ। প্রকাশনা কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন আবদুল্লাহ আল নোমান ও হাবিবুল ইসলাম হাবিব এবং স্মরণিকা কমিটির দায়িত্বে আছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আব্দুস সালাম।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে এই সূবর্ণ জয়ন্তী পালনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছি। এর কারণ বিএনপি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দল।

এ জন্য আমাদেরই সূবর্ণ জয়ন্তী পালন দায়িত্ব মনে করি। তিনি বলেন, আমাদের কর্মসূচি থাকবে সারা বছরব্যাপী। শুধু ঢাকায় নয়, প্রত্যেক সিটি করপোরেশন, প্রত্যেক জেলা সদর এবং উপজেলায় তৃণমূল পর্যন্ত কর্মসূচি পালন করব। বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতেও আমরা অনুষ্ঠান করব।

সংগঠন গোছানো ও চেইন অব কমান্ড : দলটির মধ্যম সারির এক নেতা আলাপকালে কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, বিএনপির দল গোছানোর কার্যক্রম যেন ছোট গল্পের মতো- ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ। বছরের পর বছর, চলছে তো চলছেই।’ তবে ২০২১ সালে সংগঠন গোছানোর কাজ পুরোপুরি শেষ করতে চায় বিএনপির হাইকমান্ড।

নতুন এই বছরে সীমিত পরিসরে হলেও একটি কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন না এলেও কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদে কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আনা হতে পারে। কাউন্সিল অনুষ্ঠানে বিলম্ব হওয়ায় বেশ কিছু শূন্য পদে ইতোমধ্যে নিয়োগ দিতে শুরু করেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

এই প্রক্রিয়া আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে। বিএনপি বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের ঐক্য ধরে রাখার বিষয়টিতেও সর্বোচ্চ নজর দিচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে হচ্ছে হাইকমান্ডকে। দলের দুই প্রভাবশালী ভাইস চেয়ারম্যানকে সম্প্রতি শোকজ করা হয়েছে। জানা গেছে, এ শোকজের মধ্য দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব সংগঠনের সকলপর্যায়ে একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে। সেটি হচ্ছে, দলের চেইন অব কমান্ডই মুখ্য, এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না।

জানা গেছে, শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে নয়, তৃণমূলেও যাতে চেইন অব কমান্ড থাকে সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো নেতা যাতে শৃঙ্খলাবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হয়, সে ব্যাপারে ইতোমধ্যে কঠোর বার্তা পাঠানো হয়েছে। দলের শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে যুক্ত হলে তাদের বহিষ্কার করা হবে বলেও সতর্ক করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে হাইকমান্ডের এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যারা পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তাদের কোনো ছাড় দেয়া হচ্ছে না। প্রথমে তাদের নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। কিন্তু যারা শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্ত মানছেন না তাদের বহিষ্কার করা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দলে ঐক্য রয়েছে। বিএনপিকে ভাঙতে সরকার নানা ষড়যন্ত্র করলেও তাতে সফল হয়নি। এত মামলা-হামলার পরও বিএনপির একজন নেতাও দল ছেড়ে যাননি। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা।

সুুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিকে ইস্যুতে পরিণত করা : নতুন বছরে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের দাবিকে ইস্যুতে পরিণত করতে চায় বিএনপি। দলটির হাইকমান্ডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকার আরো দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায়। আর সেই প্লান থেকেই নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব কৌশলে অনীহা ঢুকিয়ে দিয়েছে।

ভোটার বিমুখতাকেই তারা ক্ষমতায় থাকার একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে। দলটি মনে করছে, জাতীয় নির্বাচনী এই ধারার অবসান হতে পারে কেবল সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এবং সেটি হতে হবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই। বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, গত দু’টি একতরফা জাতীয় নির্বাচন প্রমাণ করেছে,

দলীয় সরকার অর্থাৎ আওয়ামী লীগের অধীনে কেনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এ জন্য নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই ফিরে যেতে হবে। সেটি যে প্রক্রিয়াই হোক। নতুন নির্বাচনের আগে দলীয় সব কর্মসূচির মাধ্যমে আবারো সরকারের ওপর এই চাপ প্রয়োগ করা হবে বলে তারা বলেছেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*