১১৭ দিন পর ক্রিকেটের কামব্যাক, মাশরাফীর নেতৃত্ব ত্যাগ

চলতি বছরের মার্চের শুরুতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়েছিল ইংল্যান্ড দল। স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিউজিল্যান্ডের তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজও চলছিল। অনেক অনিশ্চয়তার পর তিন দফায় পাকিস্তান সফরে রাজি হওয়া বাংলাদেশ দলের তৃতীয়বার সেখানে যাওয়ার কথা ছিল টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ খেলার জন্য। ক্রিকেটের এই ব্যস্ত সাজানো-গোছানো সংসার এক কালো ঝড় এসে সব এলোমেলো করে দেয়। বিশ্বব্যাপী ভয়াল রূপ ধারণ করা করোনাভাইরাসকে ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারি ঘোষণা করে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজটি শেষ করতে চাইলেও দ্বিতীয় ওয়ানডের আগের দিন ১৪ মার্চ তা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো বিশাল আয়োজন যে করোনা পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়, তা অনুধাবন করতে পেরে গত জুলাইয়ে এ বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এক বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আইসিসি। গত ১৮ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় হওয়ার কথা ছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সপ্তম আসর। ২০২১ সালের অক্টোবর নভেম্বরে ভারতে হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, পরের বছর অস্ট্রেলিয়ায় একই সময়ে হবে আরেকটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। একে একে স্থগিত হতে থাকে ভবিষ্যৎ সূচিতে থাকা সব সিরিজ। ক্রিকেট বিশ্ব যেন স্থবির হয়ে যায়। ক্রিকেটের ফিরে আসা : মে মাসের শেষে আবারও মাঠে ক্রিকেট ফেরার সম্ভাবনা জোরালো হয়; ইংল্যান্ড সফরে যেতে সবুজ সংকেত পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল।

সিরিজ সফলে এগিয়ে আসে আইসিসি। কঠিন এই সময়ে নিয়ম-কানুনে কিছু পরিবর্তন এনে মাঠে ক্রিকেট ফেরার পথ সহজ করে। তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজটি মূলত শুরু হওয়ার কথা ছিল গত ৪ জুন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জৈব-সুরক্ষা বলয়ে সিরিজটি মাঠে গড়ায় ৯ জুলাই। দীর্ঘ ১১৭ দিন পর আবারো পৃথিবীর বুকে ফিরে আসে ক্রিকেট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত দীর্ঘ সময় ধরে অন্যতম জনপ্রিয় এই খেলাটি আগে কখনো মাঠে না গড়ানোর নজির নেই। সাউদাম্পটনের রোজ বোলে ক্রিকেট ফেরার সেই ম্যাচে গ্যালারি ছিল দর্শকশুন্য, কিন্তু টিভি সেটের সামনে বহুকাল পর ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে পাওয়ার আনন্দ আরও বেড়ে গিয়েছিল রোমাঞ্চকর এক ম্যাচের কল্যাণে। ক্যারিবীয় পেস আক্রমণের সামনে প্রথম ইনিংসে মুখ থুবড়ে পড়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং।দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ালেও ম্যাচ বাঁচাতে পারেনি তারা; ৪ উইকেটে জিতে এগিয়ে যায় সফরকারীরা। পরের দুটি টেস্ট জিতে অবশ্য সিরিজ জয় নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা। সবকিছু ছাপিয়ে ক্রিকেটেরই জয় হয়, করোনাকালে বিদেশ সফর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সাহসিকতার গল্প অমর অধ্যায় হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় ঠাই করে নিয়েছে। এরপর পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়া দলও ইংল্যান্ড সফরে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। সীমিত ওভারের সিরিজ ও টেস্ট সিরিজ খেলতে এখন অস্ট্রেলিয়ায় আছে টিম ইন্ডিয়া। ফ্রাঞ্চাইজি লীগের মধ্যে সবার আগে মাঠে গড়িয়েছে ক্যারিবীয়ান প্রিমিয়ার লীগ (সিপিএল)। করোনা সংক্রমণ ভারতে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল) অনুষ্ঠিত হয়। অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে চলছে বিগ ব্যাশ লীগ। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) এ বছর আর অনুষ্ঠিত না হলেও মাঠে ঠিকই ক্রিকেট ফেরাতে পেরেছে বিসিবি।

দেশি ক্রিকেটারদের নিয়ে ওয়ানডে ফরম্যাটে প্রেসিডেন্টস কাপের পর বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ আয়োজন সবাইকে সন্তুষ্ট করেছে। জৈব সুরক্ষা বলয়ে অনুষ্ঠিত এই দুই টুর্নামেন্ট সম্পন্ন সফলভাবে করতে পারায় আগামী জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরে আসবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল। মাশরাফীর অধিনায়কত্ব ত্যাগ : জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচের আগের দিন ৫ মার্চ সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে অনুশীলন থেকে আকস্মিকভাবে প্রেস ব্রিফিংয়ের জন্য এগিয়ে যান অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। তিনি ঘোষণা দেন, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আগামীকালকের ম্যাচই অধিনায়ক হিসেবে আমার শেষ ম্যাচ। এরপর সুযোগ পেলে জাতীয় দলে খেলা চালিয়ে যাবো। অধিনায়কত্ব ছাড়ার এটিই ভালো সময়। ২০২৩ বিশ্বকাপ সামনে রেখে দলের পরিকল্পনা করা উচিৎ। পরদিন ৬ মার্চ মাশরাফীর নেতৃত্বে জিম্বাবুয়েকে টাইগাররা শুধু হোয়াইটওয়াশই করেনি, মাতাভারের উইকেটটা যখন নড়াইল এক্সপ্রেস নিলেন, অধিনায়ক হিসেবে শততম উইকেট পূর্ণ করে যেন নিজের বিশেষ ম্যাচকে মহিমান্বিত করে রাখেন। এই কীর্তি শতাধিক বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে মাত্র চার ক্রিকেটারের আছে।

ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, শন পোলক ও জেসন হোল্ডারের মতো নামগুলোর পর মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নামটিও যে সংক্ষিপ্ত এই তালিকায় ঢুকে পড়েছে। নিজের বিদায়ী অধিনায়কত্বের ম্যাচে আরেকটি ইতিহাস গড়েই মাঠ ছাড়েন ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক। প্রথম বাংলাদেশি অধিনায়ক হিসেবে তিনি জয়ের ফিফটি গড়েন।অধিনায়কত্বের সমাপ্তি লগ্নে সতীর্থদের আবেগঘন ভালবাসায় সিক্ত হন দুই হাঁটুতে ৭ বার অপারেশনের পরও অদম্য সাহসী হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়া এই ক্রিকেটার। প্রতিটি খেলোয়াড় মাশরাফীর ২ নম্বর জার্সি পরিধান করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।জার্সির সামনে লেখা ছিল THANK YOU CAPTAIN লাল-সবুজের দলের ভেতর হার না মানা মানসিকতা ছড়িয়ে দিয়ে নিজের নেতৃত্বগুণে সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করা মাশরাফী অধীনেই ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে ও ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে খেলে। ঘরের মাঠে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জেতার কীর্তিও টাইগাররা মাশরাফীর নেতৃত্বেই পেয়েছিল।অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ব জয় : নারী ক্রিকেট মানেই যেন অস্ট্রেলিয়ার জয়জয়কার। বছরের শুরুতে আরও একবার তার সাক্ষী হয় ক্রিকেট বিশ্ব। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে রেকর্ড ৮৬ হাজার দর্শকে পূর্ণ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ভারতকে ৮৫ রানে হারিয়ে পঞ্চমবারের মতো শিরোপা উৎসব করে অস্ট্রেলিয়া নারী দল।দুই ওপেনার অ্যালিসা হিলি ও বেথ মুনির বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের রেকর্ড রান তোলে অস্ট্রেলিয়া। ১৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ৯৯ রানেই অলআউট হয়ে যায় ভারত। অফিসিয়াল হিসেবে ফাইনালের দর্শক ছিল ৮৬ হাজার ১৭৪। ক্রিকেট তো বটেই, অস্ট্রেলিয়ায় নারীদের যে কোনো ক্রীড়া ইভেন্টে সবচেয়ে বেশি দর্শকের রেকর্ড এটি।

টেস্টে ব্রডের ৫০০, অ্যান্ডারসনের ৬০০ : জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্টের শেষ দিনে ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটকে এলবিডব্লিউ করে ৫০০ টেস্ট উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন স্টুয়ার্ট ব্রড। ৫০০ উইকেটের অভিজাত ক্লাবে ব্রডের আগে ইংল্যান্ডের একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন তার দীর্ঘদিনের বোলিং জুটির সঙ্গী জেমস অ্যান্ডারসন। মাসখানেক পর সাউদাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টের শেষ দিনে অ্যান্ডারসন গড়েন অনন্য কীর্তি। বল আজহার আলীর ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপে জমা পড়ে জো রুটের হাতে- সেই সঙ্গে প্রথম পেসার হিসেবে ৬০০ টেস্ট উইকেটের মালিক বনে যান ৩৮ বছর বয়সী ডানহাতি এই বোলার।অবসরে ধোনি : মহেন্দ্র সিং ধোনি কবে অবসর নেবেন – দীর্ঘদিন ধরে চলছিল এই আলোচনা। অবশেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আইপিএল শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে গত ১৫ অগাস্ট আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। একই দিনে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একইভাবে ইনস্টাগ্রাম বার্তায় ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দেন ভারতের আরেক ক্রিকেটার সুরেশ রায়না।ওয়ানডেতে লিটনের বর্ষসেরা ইনিংস : আইসিসির ফিউচার ট্যুর প্ল্যান অনুযায়ী ২০২০ সালে বাংলাদেশের হাতে যেসব সিরিজ ছিল, করোনা মহামারির কারণে তা কমে যায়। চলতি বছরে ওয়ানডে বলতে কেবলই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠে তিন ম্যাচের সিরিজ খেলেছে টাইগাররা।আর এই তিন ম্যাচ খেলেই ২০২০ সালের সেরাদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন লিটন দাস। এ বছর ওয়ানডে ক্রিকেটের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের এই ক্লাসিক ওপেনার।জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে দারুণ সময় পার করেছেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। ওই সিরিজে তিনি ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ১৭৬ রানের একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন, যা ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। শুধু তাই নয়, চলতি বছরে বিশ্বের কোন ক্রিকেটার লিটনের চেয়ে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান করতে পারেননি।

যদিও খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ না পাওয়ায় সেরা দশ সংগ্রাহকের তালিকায় ঢুকতে পারেননি লিটন। ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি রান তোলা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় তিনি রয়েছেন ১২ নম্বরে। তার সতীর্থ তামিম রয়েছেন ১৩ নম্বরে।ওই সিরিজেই ১৫৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি, যা ছিল চলতি বছর ওয়ানডেতে প্রথম দেড়শো রানের ইনিংস। বছরে গড় রানের হিসাবেও সবার ওপরে বাংলাদেশের এ দুই ওপেনার। লিটনের ১৫৫.৫ ও তামিমের ১৫৫। মাত্র তিন ম্যাচ খেলে লিটন করেন ৩১১ রান, তামিম ৩১০। দুই ব্যাটসম্যানই দুটি করে সেঞ্চুরি হাঁকেন।এ বছরে সবচেয়ে বেশি রান তোলার তালিকায় সবার উপরে রয়েছেন অ্যারন ফিঞ্চ। ১৩ ইনিংসে ৬৭৩ রান করেছেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। সর্বোচ্চ চারবার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়েছেন ভিভ রিচার্ডস ও ডেসমন্ড হেইন্স। তিনবার করেছেন ভারতের রোহিত শর্মা। আর দুইবার করে এই তালিকায় আছেন শচীন টেন্ডুলকার এবং ইয়ান চ্যাপেল।এ বছর ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকার করেছেন অস্ট্রেলিয়ার লেগ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা। ১৩ ম্যাচে তিনি নিয়েছেন ২৭ উইকেট।এছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলার আলজারি জোসেফ ১৮ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন।সম্প্রতি টেস্টে ভারতকে ৩৬ রানে অলআউট করে দেয়ার নায়ক অজি বোলার জস হ্যাজলউল ১৬ উইকেট নিয়ে রয়েছেন তৃতীয় স্থানে। বছরে সেরা বোলিং ফিগারের মালিক নেপালের তরুণ স্পিনার স›দ্বীপ লামিচানে। যুক্তরাষ্ট্র্রের বিরুদ্ধে ম্যাচে মাত্র ১৬ রান দিয়ে তিনি নিয়েছেন ৬ উইকেট।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*