নতুন বছরে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জে মুখে আওয়ামী লীগ!

২০২১ সালকে চ্যালেঞ্জের বছর বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে তিনটি চ্যালেঞ্জকে সবচেয়ে বড় হিসেবে দেখছে দলটি। এগুলো হচ্ছে- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে সাংগঠনিক সক্ষমতা তৈরি, বিতর্কিতদের দমন ও ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় অংশগ্রহণ। সংশ্লিষ্টরা জানান, টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে একশ্রেণির নেতাকর্মীর মধ্যে অপরাধে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

এদের কারণে মাঝেমধ্যেই দল ও সরকার বিব্রত হচ্ছে। কোনো ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রচার না পাওয়া পর্যন্ত এ ধরনের নেতাকর্মী বা দুষ্কৃতকারীরা দলীয় পরিচয় নির্বিঘ্নে ব্যবহার করে যান। তাদের নিয়ন্ত্রণ করাটা আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া করোনার কারণে ২০২০ সালে সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।

২০২১ সালে সেটা সম্পন্ন করতে হবে। এটা সাংগঠনিকভাবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। তাদের মতে- মন্ত্রী ও এমপিরা চান তাদের বলয়ের বাইরে কেউ যেন কমিটিতে স্থান না পান। অন্যদিকে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশ- যারা ত্যাগী ও পরীক্ষিত তাদের কমিটিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এসব মোকাবিলা করে কমিটি গঠন করাটা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ বলে ভাবছেন তারা। এ ছাড়া করোনা নাগরিক জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

এই মহামারি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে দলীয়ভাবে অংশ নেয়াকেও চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। এসব প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, জাতীয় সম্মেলনের পরই আমরা করোনার মতো মহামারির কবলে পড়েছি। তাই সাংগঠনিকভাবে যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল সেভাবে এগোতে পারিনি।

বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারিনি। এসব কমিটির মাধ্যমে দলের নতুন নেতৃত্বের আগমন ঘটে। তাই ২০২১ সালে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সব জেলা ও উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা। তিনি বলেন, এটা করাটা দুঃসহ বিষয়। কারণ প্রায় সব জেলায় মন্ত্রী ও এমপিরা আছেন। তাদের নিজস্ব বলয় রয়েছে। কমিটি গঠনে এসব বলয় বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এসব মোকাবিলা করে আমাদেরকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে হবে। ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তা না হলে দলের দুঃসময়ে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগ হচ্ছে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল।

২০২১ সালেও এই সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী, উগ্র ধর্মান্ধ শক্তির উত্থান রোধ করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ তো সব সময় রয়েছে। এসব সামনে রেখেই আওয়ামী লীগ সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ২০২১ সালকেও আমরা চ্যালেঞ্জের বছর হিসেবে ধরে নিয়ে সফলতার দিকে অগ্রসর হবো।

এদিকে আওয়ামী লীগ জানিয়েছে, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলটির ৫০ হাজারের বেশি কমিটি আছে। তাতে পদের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৬৪টি জেলা ও ১২টি সিটি করপোরেশন সহ মোট সাংগঠনিক জেলা কমিটি ৭৮টি। এসব জেলার আওতায় ৬২২টি উপজেলা কমিটি, ৫ হাজার ৬৪৩টি ইউনিয়ন কমিটি ও ৪৩ হাজার ৫৯৬টি ওয়ার্ড কমিটি রয়েছে।

আওয়ামী লীগের মূল দলের বাইরে আটটি সহযোগী ও দু’টি ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনেরও তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কমিটি আছে সারা দেশে। এতেও লাখো নেতাকর্মী দলীয় পদ পান। বিদেশেও প্রবাসীদের নিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি রয়েছে। এর বাইরে পেশাজীবী ও বিভিন্ন খাতে আওয়ামী লীগের সমমনা হিসেবে আরো অনেক সংগঠন আছে।

এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরাও সরকারি দলের পরিচয় ব্যবহার করেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুসারী হিসেবে এসব কমিটিতে ঢুকে পড়েন অনেকে। অনেক কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকে। তারা নিজ নিজ পক্ষের শক্তি বাড়াতে অনেক সময় বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে টানেন। আবার টাকার বিনিময়ে দলীয় পদ দেয়ার অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন সময়।

নতুন বছরে এ ধরনের অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলে শীর্ষ নেতারা জানান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা বলেন, দল ও সরকার আলাদা করা গেলে দুটিই গতিশীল হবে। তাই নতুন বছরে দলকে সুসংহত করার ওপর জোর দিচ্ছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, নতুন বছরের শুরু থেকেই জাতীয় ও উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক অ্যাকশনে যাবে আওয়ামী লীগ। সারা দেশে এ তালিকা ৩ শতাধিক। প্রথমে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হবে। পরে নেয়া হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

শাস্তির মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই রকমই রয়েছে। প্রত্যক্ষ শাস্তির মধ্যে আছে-দল থেকে অথবা পদ থেকে সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কার। পরোক্ষ শাস্তি হিসেবে রয়েছে-এমপি পদ থেকে শুরু করে যেকোনো নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না দেয়া। মূলত তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করতেই এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে দলটি। কেন্দ্রীয় কয়েক নেতা জানান, প্রায় ২০০ জন নেতার বিরুদ্ধে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে সরাসরি কাজ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া সহযোগী সংগঠনের আরো শতাধিক নেতার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ৬০ জন এমপি-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। সবমিলিয়ে ২০২১ সালে দল হিসেবে নিজেদের সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করবে বলে জানান দলটির শীর্ষ নেতারা। পাশাপাশি রাজনৈতিক মাঠে নিজেদের শক্তিমত্তাও ধরে রাখতে চান তারা।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*