৬৪ দেশের ১৪১ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে প্রথম হলেন বাংলাদেশের তাহমিনা

চট্টগ্রামের মেয়ে উম্মে তাহমিনা হক। পুরোনো শহর, ইতিহাস কিংবা লোকগল্পের প্রতি ইউনি’ভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) স্থাপত্য বিভাগের এই শিক্ষা’র্থীর আ’লাদা টান আছে। শেষ বর্ষে থিসিসের বি’ষয় হিসেবে তাই নিজের প্রিয় শহর আর তার ইতিহাস বেছে নিয়ে’ছিলেন তিনি। তখনো অবশ্য জানতে’ন না, তাঁর এই প্রকল্প জিতে নেবে তামায়ুজ অ্যাওয়ার্ড ২০২০।

স্নাতকের শিক্ষার্থীদের স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা ও ল্যান্ডস্কেপ নকশার কাজ জমা পড়েছিল এই প্রতিযো’গিতায়। এ বছর এই পুরস্কারের জন্য ৬৪টি দেশের ১৪১টি বিশ্ববি’দ্যালয়ের ১০৮৯টি প্রকল্প জমা পড়ে। তাহমিনা পেয়ে’ছেন প্রথম ‘পুরস্কার। এই জয়ের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতায় এ ব’ছরের সেরা স্থাপত্য অনুষদের সম্মানও অর্জন করেছে ইউএপি’র স্থাপত্য বিভাগ। এ ছাড়া উম্মে তাহমিনার স্নাতক প্রকল্পের তত্ত্বাব’ধায়ক হিসে’বে ইউএপির স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক মেহরাব ইফতেখার এ বছরের সেরা থিসিস সুপারভাইজার নির্বাচিত হয়েছেন।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহু পুরোনো। এই বন্দরেই নোঙর ফেলেছিলেন আরব ও পর্তুগিজ বণিকেরা। দূর দেশের বণিক আর স্থানীয় সওদাগরদের এক মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল এখানে। এসব নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন তাহমিনা। তিনি বলেন, নগরীর চারদিকে চাক্তাই খাল ছিল পানিপথে বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। সেই চাক্তাই খালের পাড়েই গড়ে উঠেছিল আসাদগঞ্জ। যেখানে অষ্টাদশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা শুঁটকি মাছের বাজারটি আজও দেশের সবচেয়ে বড় শুঁটকির আড়ত। অথচ ঐতিহাসিক চাক্তাই খাল আজ পরিচিতি পায় ‘চট্টগ্রামের দুঃখ’ হিসেবে। খাল ভরাটের কারণে পানিপথ মৃতপ্রায়। তাই স্থলপথে বেড়েছে চাপ।

সওদাগরদের বাসস্থান ও বাণিজ্যের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা দোকানবাড়ির (শপ হাউজ) প্রাচীন স্থাপনা কৌশল আজ বিলুপ্তপ্রায়। নিজের থিসিস প্রকল্পে এই ইতিহাস আর সমস্যাগুলোর সমাধানই খুঁজে ফিরেছেন তাহমিনা। তাহমিনার প্রকল্পের সুপারভাইজার মেহরাব ইফতেখার বলেন, ঐতিহাসিক আসাদগঞ্জ ও চাক্তাই খাল সংলগ্ন এলাকাটি একটি চলমান ও জীবন্ত সংস্কৃতি। স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি যেকোনো অভিজ্ঞ স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে তাহমিনার প্রস্তাবিত নকশা শুধু সংবেদনশীল, সুচিন্তিত ও নান্দনিকই নয়, এটি পরিমিত, সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। এই প্রকল্পে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী ঘুরপাক খাচ্ছিল তাহমিনার মাথায়? তিনি বলেন, ‘আজকাল আমরা আমাদের ঐতিহাসিক কৌশল, নিয়ম, স্থাপনা বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভালো–মন্দ চিন্তা না করেই পরিবর্তন করে ফেলি। অথচ এই কৌশল বা নিয়মগুলো যুগ যুগ ধরে সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব

থাকে আমাদের সমাজে, সংস্কৃতিতে, সর্বোপরি জীবনযাত্রায়। নতুন প্রযুক্তি, নিয়ম অবলম্বন করতে গিয়ে অনেক সময় আমরা নিজেদের পরিচয়কেই বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিই৷’ বন্দর নগরীর আসাদগঞ্জ কী করে দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে প্রভাব রাখছে, সেই ইতিহাস নিয়ে ভেবেছেন স্থাপত্যের এই শিক্ষার্থী। তাঁর মতে, পুরোনো ও নতুনের মেলবন্ধনে অতীতকে মাথায় রেখেই ভবিষ্যৎ নগরীর কথা চিন্তা করা উচিত। তাহমিনা জানান, তাঁর এই প্রকল্পে সার্বিক তত্ত্বাবধানে আরও ছিলেন ইউএপির স্থাপত্য অনুষদের শিক্ষক জিয়াউল ইসলাম ও এস এম এহসান উল হক।

বিজয়ী তাহমিনা ইরাকি বিজনেস কাউন্সিলের অর্থায়নে ইতালির পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি অব মিলানে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ পাবেন। তাঁর প্রকল্পের শিরোনাম ছিল, ‘আ সেলিব্রেশন অব ট্রেড অ্যান্ড ট্রেডিশন’। তাহমিনার চাওয়া—বন্দর নগরীর পরিকল্পনায় যেন এর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাচীন কৌশলের সঙ্গে বর্তমান প্রযুক্তির মিশেলে হয় সংস্করণ ও সংরক্ষণ।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*