আমি ভাইয়ার দিকে তাকাতে সেন্সলেস হয়ে গেলাম

আমি ভাইয়ার দিকে তাকাতে চাইলাম।তার ডাকের সাড়া দিতে চাইলাম। কিন্তু সম্ভব হলো না।এর আগেই শরীর কাঁপতে লাগলো কেমন। তারপর সেন্সলেস হয়ে গেলাম আমি!

চোখ খুললো আমা'র ঘন্টা খানেক পর। চোখ খুলে দেখি আমি খাটের উপর শুয়ে আছি।মা আমা'র মাথায় পানি ঢালছে। বাবা খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে।আর ভাইয়া তখনও আমা'র হাত ধরে বসে আছে আমা'র দিকে তাকিয়ে।তার চোখ টলমল করছে জলে। আমা'র চোখের পাতা খুলতে দেখেই সে টপটপ করে চোখ থেকে কয়েক ফো’টা জল ছেড়ে দিলো। তারপর এই কান্নার মাঝেই হেসে ফেললো, শব্দহীন ভাবে।আর আমা'র হাতটা আরো শক্ত করে ধরে বললো,’এখন কেমন লাগছে তূর্ণা?’
আমি কান্নামাখা গলায় বললাম,’ভালো।’
ভাইয়া একহাতে তার চোখ মুছতে মুছতে বললো,’আমা'র উপর রাগ করেছিস খুব না?’
আমি কেঁদেই ফেললাম এবার শব্দ করে।
ভাইয়া আমা'র চোখ মুছিয়ে দিলেন।
আমি ভেজা গলায় বললাম,’ভাইয়া,আমি অনেক বড়ো ভুল করে ফেলেছি।আসলে তখন কিছুই বুঝতে পারিনি। তোদের কারোর কথাই তখন মনে আসেনি।একটা অন্ধ মোহে পড়ে একটা ছেলেকে ভালো ভাবে না জেনে না বোঝে এসব করা আমা'র ঠিক হয়নি!’
ভাইয়া মৃ'দু হাসলো। হেসে বললো,’ভুল করার পর ভুল যে বুঝতে পারে সে জ্ঞানী মানুষ।আর ভুল বুঝতে পারার পর যে ভুল শুধরে নিতে পারে সে মহৎ মানুষ!তুই তোর ভুল বুঝতে পেরেছিস এই জন্য তুই জ্ঞানী মানুষ হিসেবে প্রমাণিত হলি। এখন এক কাজ কর।ভুলটা শুধরে নে।’
আমি মৃ'দু হাসলাম। হেসে বললাম,’আমি আর কোনদিন কাউকে সামান্য দুঃখও দিবো না। কোনদিন না। আমি তোমা'দের সব কথা মেনে নিবো।’
মা বললেন,’তাহলে আজ থেকে কোন রকম দুশ্চিন্তা করা যাব'ে না। এবং তোর অতীতকে চিরতরে ভুলে যেতে হবে!’
আমি বললাম,’ভুলে যাব'ো মা।’

মা এবার ভাইয়াকে বললেন,’নেহাল,তুই আগামীকাল বারহাট্টা যাব'ি। ছেলেটাকে গিয়ে দেখে আসবি। ওদের বাড়িঘর,ফ্যামিলি সব দেখবি।আশ পাশের মানুষদের সাথে কথা বলে ছেলের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করবি। সবকিছু ভালো হলে ছেলেকে আসতে বলবি। সাথে মুরব্বিরাও আসবে।’
ভাইয়া মা'র কথার পর খানিক সময় চুপ করে রইলো। তারপর বললো,’তূর্ণার বিয়ে হবে না!’
বাবা মা দুজনেই চমকে উঠলেন।মা খানিক সময় হা করে থেকে সামান্য তুতলে বললেন,’মানে?কী বলতে চাইছিস তুই?’
‘বলতে চাইছি তূর্ণার বিয়ের সময় হয়নি এখনও।ওর অনেক পড়াশোনা করতে হবে। পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তারপর বিয়ে।’
মা মুখ ভেঙচিয়ে বললো,’বিয়ের বয়স এখনও হয়নি তুই বলতে চাইছিস?’
ভাইয়া বললো,’হু’ম।তাই।’

মা বললো,’তো সে নিজে নিজে যে বিয়ে করলো ওটা কী? বিয়ের বয়স না হলে সে বিয়ে করলো কীভাবে?’
ভাইয়া খানিক সময় চুপ করে রইলো। তারপর বললো,’মা,একটু আগে তূর্ণা কী বলেছে শুনেছিলে?’
মা অবাক হয়ে বললেন,’কী বলেছিলো?’
‘ও বলেছিলো সে ভুল করেছে।আর কখনও এমন ভুল করবে না। অর্থাৎ ও যে বিয়ে করেছে এটা তার ভুল।সত্যি সত্যি কোন বিয়ে নয়।’
মা বললেন,’তোর কী মাথা টাতা খারাপ হয়ে গেছে নাকি নেহাল? পাগলের মতো বকছিস! শোন, আজগু'বি কথাবার্তা বাদ দিয়ে এখন ঘু'মোতে যা।কাল সকালে নাশতা করে তুই ছেলের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবি।বুঝলে?’
ভাইয়া বললো,’বুঝেছি। আগামীকাল বারহাট্টা যাব'ো আমি। গিয়ে ছেলের সাথে কথা বলবো।বলবো,এই হারামজাদা,তোর সাহস কতো বড়ো!তুই আমা'র বোনকে বিয়ে করতে চাস?’

মা কপট রাগ দেখিয়ে এখান থেকে উঠে যেতে যেতে বললেন,’ঢং হচ্ছে।ঢং!কাল কিংবা পড়শু যখন সব জানাজানি হবে তখন কেমন হবে?আর ঢাকায় তো এতোক্ষণে ওর সব বন্ধু বান্ধব সহপাঠীরা জেনে গেছে। ওদের সামনে আর কখনো যেতে পারবে ও?নাকি লাজ শরম জলের সাথে মিশিয়ে খেয়ে ফেলেছে একেবারে!’
কথাগু'লো বলে মা এখান থেকে চলে গেলেন। এবার আমি গভীর চিন্তায় পড়ে গেলাম।মা'র কথাগু'লো মিথ্যে নয়।ঢাকায় আমা'র সাথে যে মেয়েটি হসপিটালে গিয়েছিল সে আমা'র ভালো বন্ধু নয়।ওর সাথে আমা'র শুরু থেকেই নানান কিছু নিয়ে অমিল।দিনে অন্তত তিনবার করে ওর সাথে ঝগড়া 'হতো আমা'র। তবুও বেচারি সেদিন কী মনে করে যে আমায় নিয়ে হসপিটালে গেলো তা আল্লাহ ভালো জানে!সে যায়হোক।মুদ্দাকথা হলো, আমা'র দোষ খুঁজে পেয়ে এতোক্ষণে বোধহয় সে হোস্টেল আর ক্যাম্পাসে প্রতিটি মানুষের কানে কানে পৌঁছে দিয়েছে। সম্ভবত গত কয়েকদিন হোস্টেল আর ইউনিভার্সিটির হট নিউজ ছিলাম আমিই!
ভাইয়া আমায় মুখ কালো করে শুয়ে থাকতে দেখে বললো,’কিরে মা'র কথায় মন খারাপ হয়েছে?’
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,’উহু।’
ভাইয়া এবার আমা'র মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। তারপর বললো,’তুই আগামী স'প্ত াহে আমা'র সাথে ঢাকায় যাব'ি। আবার হোস্টেলে উঠবি।’
আমি ভ'য়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,’ওরা যে সব জেনে গেছে!’
ভাইয়া বললো,’জেনে গেলে কী হয়েছে?তুই না বললি এটা তোর ভুল?তোর ভুল তুই বুঝতে পেরেছিস এবং তুই এখন ওসব পুরনো ব্যপার ভুলে যেতে চাস এটা তোর মহৎ কাজ।আর যারা তোর মহৎ কাজে বাঁধা দিবে, তোর নামে কুৎসা রটাবে এটাকে তুই দেখবি কেন?তোর তো পেছন ফিরে তাকাবার সময় নাই! তুই আগে বাড়বি। এগিয়ে যাব'ি শত্রুদের মুখে চুনকালি মেখে দিয়ে।সব সময় মনে রাখবি তুই ভুল করেছিলে।এই ভুলটাকে যে করেই হোক তোর শুধ’রাতে হবে।বাবা মা আর ভাইয়ের মুখে হাসি ফো’টাতে হবে।আজ যারা তোকে নিয়ে হোস্টেল আর ইউনিভার্সিটিতে হাসবে, তামাশা করবে তারাই একদিন তোর সফলতায় নিজে নিজে লজ্জিত হবে।’
আমি হেসে ফেললাম আনন্দে এবং এক ধরনের চাপা উত্তেজনায়।
ভাইয়া বললেন,’তবে মনে থাকে যেন সুযোগ একটাই। আবার নতুন কোন ভুল করা যাব'ে না এবং অতীতকে কোন ভাবেই টেনে আনা যাব'ে না সামনে!’

আমি বললাম,’তাই হবে।’

সকাল বেলা মা ভাইয়াকে ডেকে বললো,’কিরে তোর না বারহাট্টা যাওয়ার কথা?’
ভাইয়া বললো,’কাল রাতেই তো বললাম তূর্ণা এখন বিয়ে করবে না। পড়াশোনা করবে।’
‘পড়াশোনা করে কী হবে?জজ ব্যারিস্টার?নাকি আবার আমা'র মুখ পুড়বে?’
ভাইয়া এবার মা'র কাছে গেল। পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে মা'র আঁচলে মুখ ঘসে বললো,’মা, তোমা'র মেয়েকে অনেক বুঝিয়েছি।সে এখন মেচ্যুয়ূর। এখন আর বাচ্চাদের মতো কোনো ভুল করবে না। আরেকটা কথা হলো, তুমি যে ওকে বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছো বিয়ের পর যদি আবার কোন সমস্যা হয়?যদি কোন কারণে ওদের সংসার ভাঙে? এখন তো অহরহ এমন হচ্ছে।ছেলে মেয়ের মধ্যে মিল হচ্ছে না,তো ডিভোর্স। কোন ভাবে ছেলে মেয়ের কিংবা মেয়ে ছেলের খারাপ কোন অতীত শোনে ফেললো।ওকে, ডিভোর্স। পুত্রবধূ শশুর শাশুড়ির মন মত হয়নি,হয়ে গেল, ডিভোর্স।তো, তোমা'র মেয়েকে যদি যোগ্য করে না বিয়ে দাও।যদি ওর নিজে কিছু করার যোগ্যতা না থাকে।যদি স্বামীর উপর নির্ভর করে থাকতে হয় তাকে। তবে কোন কারণে যদি আবার ওদের সংসার ভাঙে,ডিভোর্স হয় ওর তখন ভাবতে পারো ওর কী হবে?’
মা এবার চুপ মেরে যান।

বাবা বলেন,’নেহাল, এমন করে তো আমর'া ভাবিনি বাবা!’
আমিও মনে মনে বলি, এমন করে তো আমিও কখনো ভাবিনি!
ভাইয়া এবার বলেন,’পড়াশোনা করে নিজেকে যোগ্য করে তুললে আল্লাহর রহমত কোন বিপদ এসে তাকে কাবু করতে পারে না। আজকাল যে মেয়েরা আ'ত্মনির্ভরশীল হচ্ছে তাদের মতো সুখি আর কেউ নাই।মা, তুমি তোমা'র মেয়েকে সুখি হওয়ার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিও না!’
মা বললেন,’তোর কথাই যথার্থ।তুই যা বলবি তাই হবে।’
ভাইয়া বললেন,’তাহলে আগামী স'প্ত াহেই আমি তূর্ণাকে নিয়ে ঢাকায় যাব'ো।ওর আরো দু মাস সময় আছে ফাইনাল এক্সামের।দু মাস পড়াশোনা করতে পারলে ও অনেক ভালো করবে।’
মা বললেন,’তাই যা। আগামী স'প্ত াহেই যা।’

এই সি'দ্ধান্তের পরই একটা ভ'য় ঢুকে গেল আমা'র মনে। এই যে আমি আবার হোস্টেলে ফিরবো তখন কেমন হবে?ওরা যখন আমায় শুনিয়ে শুনিয়ে ওসব মন্দ কথা বলবে তখন আমি সহ্য করতে পারবো তো?আর ইউনিভার্সিটিতেই বা কীভাবে যাব'ো? ছেলে মেয়েরা আঙুল তুলে দেখিয়ে দেখিয়ে বলবে না,এই দ্যাখো প্রস্টিটিউট টা আসছে। শুধু এতো টুকু না এরচেয়ে খারাপ কথাও তো বলতে পারে! তখন? তখন সবকিছু আমি মেনে নিতে পারবো তো?সহ্য করতে পারবো তো সবকিছু?

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*