ভয়ংকর হয়ে উঠছে ‘নারীফাঁ'দ’

কখনো মিলা, আবার কখনোবা লিনা মাহমুদ। কৌশলে বড় ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে প্রেমের অ'ভিনয়। একপর্যায়ে লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া। এজন্য ভুয়া বিয়ে নয়তো অ’শ্লী'ল কিংবা অন্তর'ঙ্গ ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হু’মকি। এভাবেই চলছিল তাদের প্রতারণা। সবশেষে টার্গেট কারওয়ানবাজারের বড় এক ব্যবসায়ী। কৌশলে বাসায় ডেকে ভুয়া বিয়ের কাগজপত্র তৈরি করে দাবি করা হয় ৭ লাখ টাকা। ওই ব্যবসায়ী স্ট্যাম্পে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এতেই মুখোশ উন্মোচন হয়ে যায় সেই মিলা বা লিনা মাহমুদের। আট'কা পড়েন গোয়েন্দা জালে। দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর ধরে এভাবেই প্রতারণা করে যাওয়া এই চক্রটিকে গ্রে''প্ত ার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের একটি টিম। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। দেশে কিংবা দেশের বাইরে সব জায়গাতে প্রতারণার জাল ছড়ানো চক্রটি গত ৫ বছরে এভাবে কোটি টাকার ওপরে হাতিয়ে নিয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার গো'লাম মোস্তফা রাসেল বলেন, এই চক্রের মোট সদস্য ৫ জন। এর মধ্যে লিনা মাহমুদ ওরফে মিলা হচ্ছে প্রধান। বাকিরা তার সহযোগী। সহযোগীরা বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, এমনকি প্রবাসীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাকে দেয়। পরে কৌশলে ফোনে কথা বলে প্রেমের ফাঁ'দ পাতে। এক সময় প্রেমিককে বাসায় ডাকে। একপর্যায়ে অন্তর'ঙ্গ ছবি তুলে টাকা দাবি করে। অনেকে সম্মানের ভয়ে টাকাও দেন।

তিনি বলেন, চক্রটি শুধু প্রেমের ফাঁ'দ নয়, অনেক সময় ভুয়া বিয়েও করে। সেই বিয়ের কাবিনের টাকা আ'দায়ও করে। গ্রে''প্ত ারকৃতরা হলো লিনা মাহমুদ ওরফে মিলা, তার সহযোগী মনির ও ভুয়া কাজী হাবিবুর রহমান। গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রটি জানায়, গ্রে''প্ত ারকৃতরা পেশাদার সং'ঘব'দ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ধনীদের টার্গেট করে। টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে নারী সদস্যদের দিয়ে ফোন করে বিভিন্ন প্র'লোভন দেখিয়ে নির্ধারিত বাসায় ডেকে আনে। এ সময় নারী সদস্যদের দিয়ে ভিকটিমের আপ'ত্তিকর ও ন'গ্ন ভিডিও ও ছবি তোলে।

জানা যায়, গ্রে''প্ত ারকৃত ও তাদের সহযোগীরা ভিকটিমকে জিম্মি করে টাকা দিতে বাধ্য করে। টাকা না দিলে ভুয়া স্ট্যাম্প ও ভুয়া কাবিননামা আর ভুয়া কাজি দিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে। এরপর নারী নি'র্যাতন ও যৌ'তুক মা'মলার হু’মকি ও ভয়-ভীতি দেখায়। ২০ কোটি টাকা প্রতারণা করে জান্নাত এখন জে'লে : বিভিন্ন পত্রিকায় ‘উন্নত দেশগু'লোর নাগরিকত্ব’ এমন লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণাই তার ছিল পেশা। নাম জান্নাতুল। কানাডা প্রবাসী, শর্ট ডিভোর্সি অথচ নিঃসন্তান সুন্দরী-এমন নানা উপমা দিয়ে পত্রিকায় মনভোলানো বিজ্ঞাপন দেওয়া 'হতো। বিয়ে করে বিদেশে আয়েশি জীবনের সেই হাতছানির ফাঁ'দে পা দিলেই হাতিয়ে নিতেন কোটি কোটি টাকা। এভাবে জান্নাত অন্তত ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ধ’রা পড়ে সিআইডির জালে।

সিনিয়র এসপি জিসানুল হক জানান, প্রতারণার শিকার একজনের অ'ভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রতারক চক্রকে গ্রে''প্ত ার করেছি। সেইস'ঙ্গে তার ৫ সহযোগীকেও আট'ক করা হয়। তিনি জানান, এসএসসি পাস করতে না পারা জান্নাত প্রতারণায় পিএইচডি। এ পর্যন্ত প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তিনি। প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা স্বামীকে নিয়ে নামেন এই প্রতারণায়। তিনি জানান, গত বছরের আগস্টে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কানাডার নাগরিক, ডিভোর্সি সন্তানহীন, নামাজি পাত্রীর জন্য ব্যবসার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী বয়স্ক পাত্র চেয়ে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। আগ্রহীদের একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে বারিধা'রার একটি বাড়িতে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সিআইডির কাছে অ'ভিযোগ দেওয়া ভুক্তভোগী নাজির হোসেন ওই বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করেন। পরে তার স'ঙ্গে গু'লশানের একটি রেস্টুরেন্টে দেখা করেন জান্নাত। এ সময় ভুক্তভোগী নাজির দেড় লাখ টাকা ও পাসপোর্ট তুলে দেন জান্নাতের হাতে।

পরে জান্নাত নাজির হোসেনকে জানান, তিনি নিজেই পাত্রী। কানাডায় দুইশ কোটি টাকার ব্যবসা আছে। কিন্তু বর্তমানে কানাডায় অনেক শীত থাকায় নাজির হোসেনকে নেওয়া যাচ্ছে না। এরপর দেশে ব্যবসার জন্য কানাডা থেকে টাকা আনার কথা বলে ট্যাক্স, ভ্যাট, ডিএইচএল বিল ইত্যাদি খরচের কথা বলে এক কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। জান্নাত এরপর মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। নাজিরের স'ঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেন। পরে ভুক্তভোগী নাজির হোসেন এ বি'ষয়ে সিআইডিতে অ'ভিযোগ করেন। একইভাবে অন্য একজন ভুক্তভোগীর স'ঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় জান্নাতকে গ্রে''প্ত ার করে সিআইডি। সিআইডির এই কর্মক'র্তা জানান, উ'দ্ধার করা খাতায় বিগত দিনের প্রতারণার হিসাব ও ভুক্তভোগীদের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়। জান্নাতের নেতৃত্বে এই চক্রটি গত ১০ বছর ধরে এমন প্রতারণা করে আসছিল। এখন পর্যন্ত সিআইডি তাদের ২০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের সূত্র জানায়, রাজধানীতে এ ধরনের অর্ধশতাধিক চক্র রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি চক্র গ্রে''প্ত ারও হয়েছে। এদের কাজই হলো নারী দিয়ে প্রতারণার ফাঁ'দ পাতা। বিশেষ করে মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা এলাকায় এই চক্রের সদস্যরা বেশি থাকে। গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার বায়েজীদুর রহমান বলেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও প্রতারণা ফাঁ'দ পাতা কয়েকটি চক্রকে গ্রে''প্ত ার করা হয়েছে। বর্তমানে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটস অ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করেও নারীদের প্রতারণার অ'ভিযোগও পাচ্ছি। আমর'া সবাইকে সচেতনত হওয়ার পরামর'্শ দিচ্ছি। সচেতন হলেই এ ধরনের অ’পরাধ কমে যাব'ে।

ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাইবার ক্রা'ইমের অতিরিক্তি উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রতারণা অ'ভিযোগ এখনো অনেক বেশি। নারী ও পুরুষ উভয়েরই অ'ভিযোগ আসছে। তিনি বলেন, নারীদের দ্বারা ব্ল্যা'কমেইলিং শিকার যেমন হচ্ছে, তেমনি পুরুষের দ্বারা ব্ল্যা'কমেইলিং শিকার হচ্ছে অনেকে। তবে অধিকাংশই সম্মান নষ্টের ভয়ে নিজেরাই মিটিয়ে নিচ্ছে, আবার অনেকে অ'ভিযোগও দিচ্ছেন। এ ধরনের বেশ কিছু সিন্ডিকেটকে আমর'া আট'কও করেছি। নাজমুল ইসলাম বলেন, সবচেয়ে বড় বি'ষয় হলো সতর্কতা। লোভ সংবরণ করে সতর্কতার স'ঙ্গে চলাচল করলে সমস্যায় পড়তে হবে না।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*