দেশব্যাপী জাসদের পতাকা র‌্যালি অনুষ্ঠিত

২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি ও ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরে পদার্পণকে সামনে রেখে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের দুই বছরব্যাপী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিযানের উদ্বোধনী কর্মসূচি উপলক্ষ্যে জাসদের নেতা-কর্মী-সদস্য-সমর্থকরা ঢাকাসহ দেশের সকল জেলা-উপজেলা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধকালীন জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা নিয়ে পতাকা র‌্যালি করেছে।

জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে সোমবার (১ মার্চ) সকাল ১১ টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে একটি র‌্যালি দোয়েল চত্ত্বর, শিক্ষাভবন, হাইকোর্ট, মৎস ভবন হয়ে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে শিখা চিরন্তনে পুস্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শেষ হয়।

র‌্যালিপূর্ব কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দলীয় সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি, স্থায়ী কমিটির সদস্য মোশাররফ হোসেন, মীর হোসাইন আখতার, অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন।

এ সমাবেশে হাসানুল হক ইনু এমপি জাতির পিতা, রষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধুসহ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী এবং মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র-সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে মহান শহীদ ও সৈনিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জনাব হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানপন্থী আর নিন্দুকেরা যতই মিথ্যাচার করুক না কেন ১৯৭১ সাল পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তুলনা করে সারা পৃথিবীই আজ স্বীকার করে যে স্বাধীনতা বাঙালি জাতির বিকাশের সদর দরজা খুলে দিয়েছিল।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের শাসন-প্রশাসন ব্যবস্থায় অনেক ভুল ত্রুটি, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যা-কর্নেল তাহের হত্যাসহ মুক্তিযোদ্ধা হত্যা, হত্যা-খুন সামরিক শাসনের রাজনীতি, অন্তর্ঘাতের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধের রাজনীতি, দেশকে পিছনে টেনে ধরার রাজনীতি হলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পরা অনুন্নত দেশ থেকে আজ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। যারা এখনো পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন করে কি লাভ হলো বলে প্রশ্ন তোলে তারা পাকিস্তানেরই প্রেতাত্মা। এরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিরোধীতা করেছিল, ৫০ বছর পর ২০২১ সালেও এরা বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া সহ্য করে না। পাকিস্তানপন্থী প্রেতাত্মারাই বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাবার পথে বাঁধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেই চলেছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিএনপিসহ কতিপয় রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী প্রকাশ্যেই জামাতসহ পাকিস্তানপন্থীদের সাথে হাত মিলিয়ে রাজনীতি করছে। এরাই দেশের সাম্প্রদায়িকতা-ধর্মান্ধতা-মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের উৎপাদন-পুনরুৎপাদন করে চলেছে। হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনীতি-রাষ্ট্র-প্রশাসনের ছায়ায় একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ-লুটেরাগোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। এই দুর্নীতিবাজ-লুটেরাগোষ্ঠী বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ভিতর থেকে ঘর কাঁটা ইঁদুর ও উইপোকার মত কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। লুটপাট-দুর্নীতি-অপচয়ে রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ চলছে।

হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, ৫০ বছরে দেশ ও সমাজে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় দেশকে আরেক ধাপ উপরে টেনে তুলতে রাজনীতি এবং অর্থনীতির কিছু মৌলিক কিছু বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ, দরকষাকষি, আপোস সমঝোতা ও মাঝামাঝির কোন পথ নেই। যারা এখনো বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বিরোধীতার নামে বাংলাদেশের বিরোধীতা করে, যারা ১৯৭১ সালের গণহত্যার পক্ষে সাফাই গায়, যারা সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতি অস্বীকার করে এই পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, সাম্প্রদায়িক-ধর্মান্ধ-মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী শক্তি ও তাদের রাজনৈতিক পার্টনারদের রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে হবে।

তিনি বলেন, একই সাথে দুর্নীতিবাজ-লুটেরা গোষ্ঠীকেও নির্মূল করতে হবে। বাংলাদেশকে পেছনের দিকে টেনে ধরার শক্তি পাকিস্তানী প্রেতাত্মা ও দুর্নীতিবাজ-লুটেরা এই দুই গোষ্ঠীকে সমূলে নির্মূল করেই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, সংবিধানকে গোজামিল মুক্ত করে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার নীতিতে রাষ্ট্র ও সমাজকে পরিচালিত করতে হবে। দুর্নীতিবাজ-লুটেরা গোষ্ঠীকে নির্মূল করতে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বৈশ্বিক মহামারী কোভিডকালে সারা দুনিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মুক্ত বাজার অর্থনীতির উপর জনগণের ভাগ্য ছেড়ে দেয়ার ভ্রান্ত নীতি থেকে বেরিয়ে এসে বৈষম্যের অবসান করতে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে অর্থনীতিকে গণমূখী পরিকল্পিত কায়দার এগিয়ে নিতে হবে। জনস্বাস্থ্য সেবা, গণশিক্ষা, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগকে বাস্তবায়ণযোগ্য মৌলিক অধিকার হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। বাঙালির আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্যবাহী জাতীয় সংষ্কৃতি ধ্বংস করে গোজামিল ও জগাখিচুরির সংষ্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার বিপক্ষে বাঙালিয়ানার পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। শাসন-প্রশাসন ব্যবস্থাকে আরো গণতান্ত্রিক ও যুগোপযোগি করতে সংবিধান পর্যালোচনা করতে হবে।

হাসানুল হক ইনু বলেন, জাসদের প্রতিষ্ঠাতারা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। জাসদ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বলিষ্ঠ রাজনৈতিক উত্তরাধীকারী। তাই জাসদকেই স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি ও ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরে পদার্পণ উপলক্ষ্যে জাসদ জাতীয় জাগরণ ও জাতীয় উল্লম্ফনের লক্ষ্যে আজ থেকে দুই বছরব্যাপী রাজনৈতিক অভিযান শুরু করলো। এ অভিযানের মধ্য দিয়ে জাসদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি-শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী জনগণ-নারী-আদিবাসীদের পক্ষে ভারসাম্যের শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

শিরীন আখতার এমপি বলেন, জাসদ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের চেতনায় রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে। স্বাধীনতা বিরোধীরা যেন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে না পারে তার জন্য রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করবে। জাসদ একই সাথে বৈষম্য ও দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তুলবে। বাংলাদেশকে আরেকটি জাতীয় জাগরণের দিকে এগিয়ে নিতে ঢাকায় কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ও সম্পদ জেলায় জেলায় ভাগ করা, স্বাধীন শক্তিশালী কার্যকর জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন-গ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি ও জাতীয় সংসদে উচ্চ কক্ষ চালু করে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা চালু, সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকের ন্যূনতম জাতীয় মজুরি, কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম করবে।

২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি ও ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদ প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরে পদার্পণকে সামনে রেখে জাসদের দুই বছরব্যাপী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিযানের উদ্বোধনী কর্মসূচি উপলক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার পর ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন-বটতলায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ-এর ছাত্র-জনসভায় স্বাধীনতা পতাকা প্রদর্শন ও পতাকা উত্তোলণ, ৩ মার্চ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্র-জনভায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্যে দিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ডাক, ৯ মার্চ পল্টনে স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও সংগ্রামের প্রতি মাওলানা ভাসানীর নিঃশর্ত সমর্থন ঘোষণা, ১৯ মার্চ জয়দেবপুর ক্যান্টমেন্টের বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের বিদ্রোহ, ২৩ মার্চ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ও সারা দেশে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন ও স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক স্বাধীনতার পতাকাবাহী কুঁচকাওয়াজ থেকে অভিবাদন গ্রহণ, স্বাধীনতার পতাকা নিয়ে ঢাকা নগরীর রাজপথে সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার পতাকা হস্তান্তর ও বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার লক্ষ্যে উত্থিত জাতিকে দমন ও ধবংস করতে ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনীর পোড়ামাটি নীতিতে ক্র্যাকডাউন ও নির্বিচার গণহত্যার সূত্রপাত, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণাসহ ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চের ঐতিহাসিক বীরত্বপূর্ণ ও বিয়োগাত্মক ঘটনাবলীর স্মরণে ঢাকাসহ দেশের সকল জেলা-উপজেলায় পতাকা র‌্যালী অনুষ্ঠিত হয়।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*